Collected from: prothomalo.com

রাজনৈতিক দলের নাম সমতা পার্টি। আত্মপ্রকাশ ২০২৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর। সেদিন ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ৩০ জনের মতো লোক জড়ো হন। তাঁদের প্রায় সবার হাতে ছিল সমতা পার্টি লেখা পোস্টার।

নতুন দল করার দরকার হলো কেন—এই প্রশ্নে সমতা পার্টির নেতারা সেদিন বলেছিলেন, কোনো রাজনৈতিক দলই জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে না, তাই…।

সমতা পার্টির আত্মপ্রকাশের ঠিক এক বছর পর দেশের জন্য ‘কিছু করার’ চেষ্টা থেকে জন্ম নেয় পিপলস পাওয়ার পার্টি। এই দলের নেতারা নিজেদের ‘সার্বভৌমত্বের প্রহরী’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। গত ২৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবে আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে জানানো হয়, দলটির ১১ সদস্যের উপদেষ্টা কমিটি রয়েছে। তবে সেদিন উপদেষ্টাদের নামের পূর্ণাঙ্গ তালিকা দিতে পারেননি দলটির উদ্যোক্তারা।

প্রথম আলোর হিসাব অনুযায়ী, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর দেশে গত ১৫ মাসে কমপক্ষে ২৬টি রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। এর মধ্যে ৬টি দলের নামের মধ্যে কোনো না কোনোভাবে ‘জনতা’ শব্দ রয়েছে। বেশির ভাগ দলের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠান হয়েছে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে। আবার কোনো দলের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠান হয়েছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে, একটি দল নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মিছিল করে।

নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের পেছনে কয়েকটি উদ্দেশ্য কাজ করতে পারে। বিগত ১৬ বছরে যাঁরা বঞ্চিত ছিলেন, পটপরিবর্তনের পর তাঁরা নতুন করে রাজনীতিতে আসার চেষ্টা করছেন। আবার কেউ কেউ নতুন করে প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে, দখলদারত্বের মতো কাজে যুক্ত হওয়ার চিন্তায়ও রাজনৈতিক দল গঠন করতে পারেন।

বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়

সর্বশেষ গত ২৮ অক্টোবর আত্মপ্রকাশ করা রাজনৈতিক দলটির নাম ‘বাংলাদেশ ইউনাইটেড পার্টি’। গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত ১৫ মাসে আত্মপ্রকাশ করা অন্য দলগুলো হচ্ছে জনতা পার্টি বাংলাদেশ, নিউক্লিয়াস পার্টি অব বাংলাদেশ (এনপিবি), ওয়ার্ল্ড মুসলিম কমিউনিটি, বাংলাদেশ জনপ্রিয় পার্টি (বিপিপি), সার্বভৌমত্ব আন্দোলন, বাংলাদেশ সংস্কারবাদী পার্টি (বিআরপি), বাংলাদেশ জাগ্রত পার্টি, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পার্টি, জাতীয় বিপ্লবী পরিষদ, বাংলাদেশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (বিএসডিপি), বাংলাদেশ জন-অধিকার পার্টি, আমজনতার দল, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক শক্তি, দেশ জনতা পার্টি, জনতার দল, গণতান্ত্রিক নাগরিক শক্তি, ভাসানী জনশক্তি পার্টি, বাংলাদেশ নতুনধারা জনতার পার্টি, পিপলস পাওয়ার পার্টি, বাংলাদেশ রিপাবলিক পার্টি, জনতার বাংলাদেশ পার্টি, নতুন বাংলাদেশ পার্টি, বাংলাদেশ সমতা পার্টি, বাংলাদেশ আমজনগণ পার্টি এবং জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।

নির্বাচন কমিশনে (ইসি) এখন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ৫৪টি। তবে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত আছে। ইসি আরও তিনটি দলকে নিবন্ধন দিতে যাচ্ছে। এর মধ্যে নতুন ২৬টি দলের দুটি রয়েছে—এনসিপি এবং বাংলাদেশ আমজনগণ পার্টি। নতুন দলগুলোর মধ্যে ১৯টি ইসিতে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছিল।

আত্মপ্রকাশ করা দলগুলোর মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে (১৭ অক্টোবর) আমন্ত্রণ পেয়েছিল তিনটি দল—এনসিপি, ভাসানী জনশক্তি পার্টি ও আমজনতার দল। তাদের মধ্যে এনসিপি এখনো সনদে স্বাক্ষর করেনি।

নতুন দলগুলোর মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেয়েছিল এনসিপি, ভাসানী জনশক্তি পার্টি ও আমজনতার দল।

নতুন ২৬টি দলের প্রতিটির সঙ্গে যোগাযোগ করেছে প্রথম আলো। গত ২৫ অক্টোবর থেকে ৮ নভেম্বরের মধ্যে ১৫টি দলের কার্যালয়ে গেছেন প্রথম আলোর দুজন প্রতিবেদক। এর মধ্যে এনসিপি ছাড়া বেশির ভাগ দলের কার্যালয় এক বা দুই কক্ষের। বাকি ১১টি দলের মধ্যে চারটির ঠিকানায় গিয়ে কার্যালয় পাওয়া যায়নি। দলগুলো হচ্ছে নতুন বাংলাদেশ পার্টি, বাংলাদেশ সমতা পার্টি, নতুনধারা জনতার পার্টি ও জাতীয় বিপ্লবী পরিষদ।

অন্য সাতটি দলের সঙ্গে ফোনে ও মেসেঞ্জারে যোগাযোগ করেছে প্রথম আলো। দলগুলো হলো ওয়ার্ল্ড মুসলিম কমিউনিটি, বাংলাদেশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (কার্যালয় খুলনায়), সার্বভৌমত্ব আন্দোলন, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক শক্তি, নিউক্লিয়াস পার্টি বাংলাদেশ, পিপলস পাওয়ার পার্টি ও বাংলাদেশ ইউনাইটেড পার্টি।

আত্মপ্রকাশ করা দলগুলোর মধ্যে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন পেতে যাচ্ছে এনসিপি এবং বাংলাদেশ আমজনগণ পার্টি।

গণতান্ত্রিক নাগরিক শক্তির কার্যালয়

নিজের ভোট নিজের পার্টিকে দিতে…

বাংলাদেশ জনপ্রিয় পার্টির দুই কক্ষের কার্যালয় মতিঝিলের শাপলা চত্বরের কাছে পুরোনো একটি ভবনের চতুর্থ তলায়। এই কার্যালয়ে আগে চা–পাতা বেচাকেনার কাজ চলত। সেই ব্যবসায় ‘ধরা খেয়ে’ নতুন রাজনৈতিক দল করেছেন মো. সিরাজুল ইসলাম। তিনি নিজেই দলের চেয়ারম্যান। গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে আত্মপ্রকাশ করে দলটি।

জনপ্রিয় পার্টির কার্যালয়ে গত ২৬ অক্টোবর দুপুরে কথা হয় চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে। কেন দল করলেন, এই প্রশ্নে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘কোনো না কোনো দলকে ভোট দিতে হবে। আমার কোনো দলই পছন্দ না। নিজের পার্টিকে নিজেই ভোট দিতে জনপ্রিয় পার্টির প্রতিষ্ঠা।’

দল চালানোর খরচ কীভাবে জোগাড় করেন, এই প্রশ্নে সিরাজুল ইসলাম বলেন, দলের স্ট্যান্ডিং কমিটির ৯-১০ জন সদস্য প্রতি মাসে কেউ ৫০০, কেউ ১ হাজার টাকা হারে চাঁদা দেন। পার্টির অফিসের ভাড়া ২৫ হাজার টাকা। নিজের ব্যবসার কাজও এই কার্যালয়ে হয়। তাই তিনি নিজেই অফিস ভাড়ার একটি অংশ বহন করেন।

নতুন ২৬টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৬টির নামে কোনো না কোনোভাবে জনতা শব্দ রয়েছে।

বাংলাদেশ জনঅধিকার পার্টির কার্যালয়

আর্থিক সংকটে কার্যালয় করা যায়নি

২০২৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর আত্মপ্রকাশ করেই বাংলাদেশ সমতা পার্টি নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছিল। নিবন্ধন আবেদনে যে ঠিকানা (২৭/১১/১ তোপখানা রোড) দিয়েছে দলটি, সেখানে গিয়ে কোনো দলের কার্যালয় খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরে দলটির নিবন্ধন আবেদনে উল্লেখ করা একটি মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগ করে প্রথম আলো। ফোন রিসিভ করে এক ব্যক্তি নিজেকে সমতা পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচয় দেন, নাম বলেন হানিফ বাংলাদেশি।

২৫ অক্টোবর দুপুরে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে হানিফ বাংলাদেশির দেখা হয় তোপখানা রোডে। তিনি বলেন, আর্থিক সংকটের কারণে দলের জন্য কোথাও কার্যালয় নিতে পারেননি। যে কারণে শ্রমিক ফেডারেশনের অফিসে (যে ঠিকানা নিবন্ধন আবেদনে দেওয়া হয়েছে) তিনি বসেন।

হানিফ বাংলাদেশি বলেন, ‘ভোটাধিকার, গণতন্ত্র, আইনের শাসনের জন্য টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত হেঁটে ২০১৮ সালে পদযাত্রা করছি। সীমান্ত হত্যার বিরুদ্ধে প্রতীকী লাশ কাঁধে নিয়ে ফেলানীদের বাড়ি পর্যন্ত পদযাত্রা করেছিলাম।’

কেন রাজনৈতিক দল করলেন, এমন প্রশ্নে হানিফ প্রথম আলোকে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করে না। এ ছাড়া সংগঠন না থাকলে এগোনো যায় না।

বেশির ভাগ দলের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠান হয়েছে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে